দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত     রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
LIVE
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
ENGLISH

উপমহাদেশের ধর্মবিশ্বাস ও কর্মজীবন- দ্বিতীয় পর্ব


মোঃ মাকসুদুল হক
৮ ফলোয়ার
প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

উপমহাদেশের ধর্মবিশ্বাস ও কর্মজীবন- দ্বিতীয় পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ আত্মশুদ্ধির আচার — নামাজ ও রোজা

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ   

আত্মশুদ্ধির আচার — নামাজ ও রোজা

শান্তির ধর্ম ইসলাম কোনো ভোগবাদী, বিলাসী, আত্মকেন্দ্রিক বা জাতিভিত্তিক চেতনা নয়। এটি সর্বজনীন মানবিক কল্যাণ, আত্মশুদ্ধি এবং সামাজিক সমতার এক শাশ্বত দর্শন। এই দর্শনেরই অন্যতম প্রধান দুটি স্তম্ভ হলো 'নামাজ' এবং 'রোজা'। দিনে পাঁচবার সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়ানো বা নামাজ পড়ার মূল শিক্ষাই হলো মানুষের দৈনিক জীবনে নিখুঁত শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা আনা।

একজন প্রকৃত নামাজি ব্যক্তি যখন নিজের কর্মক্ষেত্রে বসেন, তখন তাঁর কাজে ফাঁকি দেওয়ার কথা নয়। কারণ, টেবিলের ওপারে কোনো তদারককারী কর্মকর্তা না থাকলেও, তিনি জানেন তাঁর প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব ওপরওয়ালার কাছে জমা হচ্ছে।

একইভাবে, 'রোজা' কেবল ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্ন-জল ত্যাগ করার নাম নয়; এটি মানুষের চোখ, কান, জিহ্বা আর মনের এক কঠিন আত্মসংযমের পরীক্ষা।

কর্মজীবনে এই রোজার সবচেয়ে বড় প্রভাব হওয়ার কথা ছিল—লোভ, লালসা, দুর্নীতি আর টেবিলের তলা দিয়ে ঘুষ নেওয়ার মানসিকতাকে চিরতরে বর্জন করা।

রোজা মানুষকে শেখায় অভাবী মানুষের ক্ষুধা ও কষ্টের মর্ম বুঝতে, যা কর্মক্ষেত্রে অধীনস্থ বা সাধারণ মানুষের প্রতি সহমর্মী হতে সাহায্য করে। এটি মূলত সামর্থ্যবানদের অন্তরে সারা বিশ্বের ক্ষুধার্ত ও পীড়িত মানুষের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

অথচ খোদ ইসলাম ধর্মের কেন্দ্রভূমি সৌদি আরবেই আজ  ভোজনের নামে যে মহোৎসব চলে, তাতে প্রতিদিন টন কে টন খাবার অপচয় করা হয়। পবিত্র কোরআনের সেই অমোঘ বাণী—"অপচয়কারী শয়তানের ভাই", সে কথা আজ বিলাসী মুসলিম সমাজ সম্পূর্ণ ভুলে গেছে।

একদিকে যখন প্রাচুর্যের অহংকারে খাবার ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে, ঠিক বিপরীত চিত্রে আফ্রিকার সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ কিংবা ক্যারিবীয় অঞ্চলের হাইতির মতো দেশের লাখো মানুষ চরম অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে সেখানকার নিষ্পাপ শিশুরা আজ কাদা মাটি দিয়ে বানানো ‘মাটির বিস্কুট খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছে। এই নির্মম বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, ধর্মীয় আচার আজ তার মূল চেতনা হারিয়েছে।

বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ালে একটা ঝটকা লাগে  ইসলাম আজ টুপি দাঁড়ি আর পাঞ্জাবীর আড়ম্বরতার আড়ালে আবদ্ধ করা শুধু লৌকিকতার সাজ মাত্র মনে হয় । আমাদের সমাজে আজ জাঁকজমক বেড়েছে, কিন্তু অন্তরের শুদ্ধতা হারিয়ে গেছে। যে হাত সকালে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সেই হাতই দুপুরে দপ্তরের জরুরি ফাইলে সই করার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঘুষের টাকা দাবি করে।

যে ব্যবসায়ী পরম নিষ্ঠার সাথে রমজানের রোজা রাখছেন, তিনিই আবার ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে ওজনে কম দিচ্ছেন কিংবা অধিক মুনাফার লোভে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন। এখানে নামাজ বা রোজা আজ মানুষের অন্তরের "সত্য" ও "সুপথ" তৈরি করতে পারছে না, বরং তা হয়ে উঠেছে সমাজের চোখে নিজেকে সৎ জাহির করার একেকটি বাহ্যিক খোলস।

বস্তুত, রোজা এবং কোরবানি মানুষের মনে যে পরম আত্মত্যাগ আর ভাতৃত্বের বন্ধনের ইঙ্গিত দেয়, তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ শিক্ষাও যদি বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করা যেত, তবে আজ এই ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোই হতো নৈতিকতা, মানবিকতা আর আত্মিক সম্পদে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও সমৃদ্ধ অঞ্চল।

আমাদের যদি অন্তরের খাঁটি বিশ্বাস আর ধর্মের এই সুমহান নৈতিক মূল্যবোধে ঘাটতি না থাকত, তবে পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই আজ আমাদের দুহাত ভরেই রহমত ও বরকত দান করতেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা আচারের আনুষ্ঠানিকতাকেই ধর্ম মেনে নিয়েছি, তার ভেতরের দর্শন ও মানবকল্যাণের অমূল্য চেতনাকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়েছি।

মুসলিম উম্মাহর এই আত্মিক ও জাগতিক দৈন্যতার মূলে যে আমাদের রূহানি অবক্ষয় দায়ী, তা মহাকবি আল্লামা ইকবাল তাঁর অমর সৃষ্টি ‘শিকওয়া’ এবং ‘জবাব-ই-শিকওয়া’-তে এক স্বর্গীয় সংলাপে ফুটিয়ে তুলেছেন। 

আল্লাহর দরবারে উম্মাহর জরাজীর্ণ দশা ও দারিদ্র্য নিয়ে যখন বান্দা অনুযোগের সুর তুলল, তখন আরশ মহল থেকে আসা স্রষ্টার সেই অমোঘ ও মরমি জবাব আমাদের বিবেককে স্তব্ধ করে দেয়। স্রষ্টা যেন পরম স্নেহে ও মৃদু ভর্ৎসনায় মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন—

"পুণ্য ভাণ্ডার খোলাই তো মোর, সে দান নেবার সায়েল কই?
যোগ্য জনের শীর্ষে আমি রত্ন-মানিক দিই আনি।"

 

এই ঐশ্বরিক বাণীর গভীরে লুকিয়ে আছে এক পরম আধ্যাত্মিক সত্য। পরম করুণাময়ের রহমত, বরকত আর নূরের দরিয়া তো সৃষ্টির আদি থেকে অবিরত বয়ে চলেছে; তার কোনো কমতি নেই। কিন্তু সেই অফুরন্ত নেয়ামতের সুধা বুকে ধারণ করার মতো পবিত্র পাত্র বা খাঁটি সায়েল (যাঞ্চাকারী) আজ কোথায়?

আমরা আজ রূহের স্পন্দন হারিয়ে কেবল দেহের আনুষ্ঠানিকতায় ধর্মকে বন্দি করেছি। আমাদের হাত আল্লাহর দিকে ওঠে ঠিকই, কিন্তু অন্তরে লুকিয়ে থাকে দুনিয়াবি লোভ, কপটতা আর অন্যায়ের অন্ধকার। 

ফকির লালন শাহ এ কারনেই সতর্ক বাণী দিয়েছেন '' হাত গড়ানো চুল দাঁড়ি জট কোন ভাবুকের এ ভাব রে ভাই আজগুবী এক বৈরাগ্য লীলা দেখে লাগে বড় ভয়''

আমরা যদি আচারের খোলস আর নফসের (কুপ্রবৃত্তি) গোলামি ভেঙে খাঁটি আশেক ও পুণ্যবান হয়ে স্রষ্টার দুয়ারে দাঁড়াতে পারতাম, তবে আল-ওয়াহহাব (সবচেয়ে বড় দাতা) আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের দুহাত ভরেই দিতেন। আমাদের ভেতরের এই আধ্যাত্মিক শূন্যতা আর বিশ্বাসের দুর্বলতাই আজ আমাদের বরকতহীন ও রূহানিভাবে দরিদ্র করে রেখেছে।

মাকসুদুল হক
(
সাংবাদিক ও কলামিস্ট, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ)

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ৫/৫ (১ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

নড়াইলে ৩ টি প্লাস্টিক বোতলে ১ গাছের চারা, পরিবেশ রক্ষায় চলো পাল্টাই বাংলাদেশের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

নড়াইলে ৩ টি প্লাস্টিক বোতলে ১ গাছের চারা, পরিবেশ রক্ষায় চলো পাল্টাই বাংলাদেশের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

দৈনিক ‘নবচিত্র’-এ যোগ দিলেন প্রবীণ সাংবাদিক রফিক মন্ডল, ২৩ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে কোটচাঁদপুরে শুরু হলো নতুন অধ্যায় বিভিন্ন মহলের শুভেচ্ছা

দৈনিক ‘নবচিত্র’-এ যোগ দিলেন প্রবীণ সাংবাদিক রফিক মন্ডল, ২৩ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে কোটচাঁদপুরে শুরু হলো নতুন অধ্যায় বিভিন্ন মহলের শুভেচ্ছা

মেম্বার হওয়ার আগেই মানুষের পাশে আলহাজ সোলেমান শেখ, রাস্তা সংস্কারসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রশংসিত তরুণ প্রার্থী

মেম্বার হওয়ার আগেই মানুষের পাশে আলহাজ সোলেমান শেখ, রাস্তা সংস্কারসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রশংসিত তরুণ প্রার্থী

হরিণাকুণ্ডুতে জমি বিরোধের জেরে মামলার বাদীর বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, প্রাণনাশের হুমকি

হরিণাকুণ্ডুতে জমি বিরোধের জেরে মামলার বাদীর বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, প্রাণনাশের হুমকি

শিক্ষক অধিকার আদায়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ঝিনাইদহের গর্ব মোস্তাফিজুর রহমান টুটুল

শিক্ষক অধিকার আদায়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ঝিনাইদহের গর্ব মোস্তাফিজুর রহমান টুটুল

তানযীমুল উম্মাহ আলিম মাদরাসায় ‘দ্রোহের জুলাই’ পালিত

তানযীমুল উম্মাহ আলিম মাদরাসায় ‘দ্রোহের জুলাই’ পালিত

অবশেষে তিনমাস ১১ দিন পর সাংবাদিক রাজিব হাসানের মোটরসাইকেল চোর গ্রেপ্তার! তার বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা, চুরি মাদক মামলা

অবশেষে তিনমাস ১১ দিন পর সাংবাদিক রাজিব হাসানের মোটরসাইকেল চোর গ্রেপ্তার! তার বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা, চুরি মাদক মামলা

পঞ্চগড় জেলা প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি সভাপতি রাসেদুজ্জামান রাসেদ সাধারণ সম্পাদক ডিজার হোসেন বাদশা

পঞ্চগড় জেলা প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি সভাপতি রাসেদুজ্জামান রাসেদ সাধারণ সম্পাদক ডিজার হোসেন বাদশা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবাসীদের সংকট নিরসন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সিআইপি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন, দুবাই-এর প্রতিনিধিদের সাথে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর মতবিনিময়

সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবাসীদের সংকট নিরসন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সিআইপি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন, দুবাই-এর প্রতিনিধিদের সাথে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর মতবিনিময়

কিডনির সুরক্ষায় লেবুর পানির জাদুকরী উপকারিতা

কিডনির সুরক্ষায় লেবুর পানির জাদুকরী উপকারিতা

৭ দফা না মানলে এক দফার আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব: ঝিনাইদহে শফিকুর রহমান

৭ দফা না মানলে এক দফার আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব: ঝিনাইদহে শফিকুর রহমান

সাংবাদিক অরিত্র কুন্ডকে নির্যাতন ও কনডেম সেলে বন্দির প্রতিবাদে  আজ হাইকোর্টে প্রেস ব্রিফিং

সাংবাদিক অরিত্র কুন্ডকে নির্যাতন ও কনডেম সেলে বন্দির প্রতিবাদে আজ হাইকোর্টে প্রেস ব্রিফিং

মঠবাড়িয়ায় ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী আটক

মঠবাড়িয়ায় ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী আটক

কোটচাঁদপুরে এইচএসসির ফল বিপর্যয়, মিষ্টির দোকানে নেই ভিড়!

কোটচাঁদপুরে এইচএসসির ফল বিপর্যয়, মিষ্টির দোকানে নেই ভিড়!

ভৈরব-বেতনার মহেশপুর  নদী ও জনপদ

ভৈরব-বেতনার মহেশপুর নদী ও জনপদ

নওগাঁয় পৌছাল সৌদি আরবের সোফা কারখানাতে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিহত আরো ৫ জনের মৃতদেহ

নওগাঁয় পৌছাল সৌদি আরবের সোফা কারখানাতে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিহত আরো ৫ জনের মৃতদেহ

নওগাঁয় বিষমুক্ত মাছ উৎপাদনে সফল প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তা নাহিদ

নওগাঁয় বিষমুক্ত মাছ উৎপাদনে সফল প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তা নাহিদ

বরিশাল বোর্ডে পাসের হারে শীর্ষে পিরোজপুর, পাসের হার ৫১.৫৫ শতাংশ

বরিশাল বোর্ডে পাসের হারে শীর্ষে পিরোজপুর, পাসের হার ৫১.৫৫ শতাংশ

উপমহাদেশের ধর্মবিশ্বাস ও কর্মজীবন- দ্বিতীয় পর্ব

উপমহাদেশের ধর্মবিশ্বাস ও কর্মজীবন- দ্বিতীয় পর্ব

মঠবাড়ীয়ায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত

মঠবাড়ীয়ায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত

BD-24.COM | Latest Bangladesh & World News

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


উপমহাদেশের ধর্মবিশ্বাস ও কর্মজীবন- দ্বিতীয় পর্ব

প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ   

আত্মশুদ্ধির আচার — নামাজ ও রোজা

শান্তির ধর্ম ইসলাম কোনো ভোগবাদী, বিলাসী, আত্মকেন্দ্রিক বা জাতিভিত্তিক চেতনা নয়। এটি সর্বজনীন মানবিক কল্যাণ, আত্মশুদ্ধি এবং সামাজিক সমতার এক শাশ্বত দর্শন। এই দর্শনেরই অন্যতম প্রধান দুটি স্তম্ভ হলো 'নামাজ' এবং 'রোজা'। দিনে পাঁচবার সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়ানো বা নামাজ পড়ার মূল শিক্ষাই হলো মানুষের দৈনিক জীবনে নিখুঁত শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা আনা।

একজন প্রকৃত নামাজি ব্যক্তি যখন নিজের কর্মক্ষেত্রে বসেন, তখন তাঁর কাজে ফাঁকি দেওয়ার কথা নয়। কারণ, টেবিলের ওপারে কোনো তদারককারী কর্মকর্তা না থাকলেও, তিনি জানেন তাঁর প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব ওপরওয়ালার কাছে জমা হচ্ছে।

একইভাবে, 'রোজা' কেবল ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্ন-জল ত্যাগ করার নাম নয়; এটি মানুষের চোখ, কান, জিহ্বা আর মনের এক কঠিন আত্মসংযমের পরীক্ষা।

কর্মজীবনে এই রোজার সবচেয়ে বড় প্রভাব হওয়ার কথা ছিল—লোভ, লালসা, দুর্নীতি আর টেবিলের তলা দিয়ে ঘুষ নেওয়ার মানসিকতাকে চিরতরে বর্জন করা।

রোজা মানুষকে শেখায় অভাবী মানুষের ক্ষুধা ও কষ্টের মর্ম বুঝতে, যা কর্মক্ষেত্রে অধীনস্থ বা সাধারণ মানুষের প্রতি সহমর্মী হতে সাহায্য করে। এটি মূলত সামর্থ্যবানদের অন্তরে সারা বিশ্বের ক্ষুধার্ত ও পীড়িত মানুষের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

অথচ খোদ ইসলাম ধর্মের কেন্দ্রভূমি সৌদি আরবেই আজ  ভোজনের নামে যে মহোৎসব চলে, তাতে প্রতিদিন টন কে টন খাবার অপচয় করা হয়। পবিত্র কোরআনের সেই অমোঘ বাণী—"অপচয়কারী শয়তানের ভাই", সে কথা আজ বিলাসী মুসলিম সমাজ সম্পূর্ণ ভুলে গেছে।

একদিকে যখন প্রাচুর্যের অহংকারে খাবার ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে, ঠিক বিপরীত চিত্রে আফ্রিকার সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ কিংবা ক্যারিবীয় অঞ্চলের হাইতির মতো দেশের লাখো মানুষ চরম অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে সেখানকার নিষ্পাপ শিশুরা আজ কাদা মাটি দিয়ে বানানো ‘মাটির বিস্কুট খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছে। এই নির্মম বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, ধর্মীয় আচার আজ তার মূল চেতনা হারিয়েছে।

বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ালে একটা ঝটকা লাগে  ইসলাম আজ টুপি দাঁড়ি আর পাঞ্জাবীর আড়ম্বরতার আড়ালে আবদ্ধ করা শুধু লৌকিকতার সাজ মাত্র মনে হয় । আমাদের সমাজে আজ জাঁকজমক বেড়েছে, কিন্তু অন্তরের শুদ্ধতা হারিয়ে গেছে। যে হাত সকালে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সেই হাতই দুপুরে দপ্তরের জরুরি ফাইলে সই করার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঘুষের টাকা দাবি করে।

যে ব্যবসায়ী পরম নিষ্ঠার সাথে রমজানের রোজা রাখছেন, তিনিই আবার ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে ওজনে কম দিচ্ছেন কিংবা অধিক মুনাফার লোভে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন। এখানে নামাজ বা রোজা আজ মানুষের অন্তরের "সত্য" ও "সুপথ" তৈরি করতে পারছে না, বরং তা হয়ে উঠেছে সমাজের চোখে নিজেকে সৎ জাহির করার একেকটি বাহ্যিক খোলস।

বস্তুত, রোজা এবং কোরবানি মানুষের মনে যে পরম আত্মত্যাগ আর ভাতৃত্বের বন্ধনের ইঙ্গিত দেয়, তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ শিক্ষাও যদি বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করা যেত, তবে আজ এই ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোই হতো নৈতিকতা, মানবিকতা আর আত্মিক সম্পদে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও সমৃদ্ধ অঞ্চল।

আমাদের যদি অন্তরের খাঁটি বিশ্বাস আর ধর্মের এই সুমহান নৈতিক মূল্যবোধে ঘাটতি না থাকত, তবে পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই আজ আমাদের দুহাত ভরেই রহমত ও বরকত দান করতেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা আচারের আনুষ্ঠানিকতাকেই ধর্ম মেনে নিয়েছি, তার ভেতরের দর্শন ও মানবকল্যাণের অমূল্য চেতনাকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়েছি।

মুসলিম উম্মাহর এই আত্মিক ও জাগতিক দৈন্যতার মূলে যে আমাদের রূহানি অবক্ষয় দায়ী, তা মহাকবি আল্লামা ইকবাল তাঁর অমর সৃষ্টি ‘শিকওয়া’ এবং ‘জবাব-ই-শিকওয়া’-তে এক স্বর্গীয় সংলাপে ফুটিয়ে তুলেছেন। 

আল্লাহর দরবারে উম্মাহর জরাজীর্ণ দশা ও দারিদ্র্য নিয়ে যখন বান্দা অনুযোগের সুর তুলল, তখন আরশ মহল থেকে আসা স্রষ্টার সেই অমোঘ ও মরমি জবাব আমাদের বিবেককে স্তব্ধ করে দেয়। স্রষ্টা যেন পরম স্নেহে ও মৃদু ভর্ৎসনায় মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন—

"পুণ্য ভাণ্ডার খোলাই তো মোর, সে দান নেবার সায়েল কই?
যোগ্য জনের শীর্ষে আমি রত্ন-মানিক দিই আনি।"

 

এই ঐশ্বরিক বাণীর গভীরে লুকিয়ে আছে এক পরম আধ্যাত্মিক সত্য। পরম করুণাময়ের রহমত, বরকত আর নূরের দরিয়া তো সৃষ্টির আদি থেকে অবিরত বয়ে চলেছে; তার কোনো কমতি নেই। কিন্তু সেই অফুরন্ত নেয়ামতের সুধা বুকে ধারণ করার মতো পবিত্র পাত্র বা খাঁটি সায়েল (যাঞ্চাকারী) আজ কোথায়?

আমরা আজ রূহের স্পন্দন হারিয়ে কেবল দেহের আনুষ্ঠানিকতায় ধর্মকে বন্দি করেছি। আমাদের হাত আল্লাহর দিকে ওঠে ঠিকই, কিন্তু অন্তরে লুকিয়ে থাকে দুনিয়াবি লোভ, কপটতা আর অন্যায়ের অন্ধকার। 

ফকির লালন শাহ এ কারনেই সতর্ক বাণী দিয়েছেন '' হাত গড়ানো চুল দাঁড়ি জট কোন ভাবুকের এ ভাব রে ভাই আজগুবী এক বৈরাগ্য লীলা দেখে লাগে বড় ভয়''

আমরা যদি আচারের খোলস আর নফসের (কুপ্রবৃত্তি) গোলামি ভেঙে খাঁটি আশেক ও পুণ্যবান হয়ে স্রষ্টার দুয়ারে দাঁড়াতে পারতাম, তবে আল-ওয়াহহাব (সবচেয়ে বড় দাতা) আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের দুহাত ভরেই দিতেন। আমাদের ভেতরের এই আধ্যাত্মিক শূন্যতা আর বিশ্বাসের দুর্বলতাই আজ আমাদের বরকতহীন ও রূহানিভাবে দরিদ্র করে রেখেছে।

মাকসুদুল হক
(
সাংবাদিক ও কলামিস্ট, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ)


BD-24.COM | Latest Bangladesh & World News

সম্পাদক ও প্রকাশক
মিরাজ হোসেন (সুজন)
দুবাই প্রবাসী সাংবাদিক ও আইটি বিশেষজ্ঞ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
উপমহাদেশের ধর্মবিশ্বাস ও কর্মজীবন- দ্বিতীয় পর্ব
0:00 / 0:00
1x
🔒