দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত     রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
LIVE
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
ENGLISH

ভৈরব-বেতনার মহেশপুর নদী ও জনপদ

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা শুধু একটি প্রশাসনিক সীমানা নয়। এটি ইতিহাস, নদীসভ্যতা,  লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাচীন বসতির এক জীবন্ত দলিল। গ্রামবাংলার শত শত বছরের ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে এই জনপদের প্রতিটি গ্রামের নামের আড়ালে।যোগীন্দ্রদ্বীপ থেকে সূর্য্যদ্বীপইতিহাসবিদ শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্রের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’-এ এই অঞ্চলের প্রাচীনত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর মতে, প্রাচীনকালে বনগাঁ ও মহেশপুর অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়েছিল ‘যোগীন্দ্রদ্বীপ’ রাজ্য। আর এই প্রাচীন রাজ্যের রাজধানী ছিল বর্তমান মহেশপুর।পরবর্তীতে সেন রাজবংশের মহারাজ বল্লাল সেন এক উত্তম কাজের পুরস্কারস্বরূপ সূর্য্যনারায়ণ নামের এক কৈবর্ত ধীবরকে (জেলে) যোগীন্দ্রদ্বীপের একটি অংশ দান করেন। রাজার দেওয়া সেই উপহারের সূত্র ধরেই অঞ্চলটি পরিচিতি লাভ করে ‘সূর্য্যদ্বীপ’ নামে। কালের বিবর্তনে সেই সূর্য্যদ্বীপই আজকের ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলা।মানচিত্র বদলের ইতিহাস১৮৬৯ সালে মহেশপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ বিভাগের আগে মহেশপুর ছিল যশোর জেলার বনগাঁ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। সে বছরের ১৮ আগস্ট বনগাঁ ভারতের ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে মহেশপুরকে যুক্ত করা হয় তৎকালীন ঝিনাইদহ মহকুমার আওতাভুক্ত হিসেবে।নদী ও জনপদের মেলবন্ধনমহেশপুর উপজেলার ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি এর নদ-নদী। এই অঞ্চলের বুক চিরে বয়ে গেছে ভৈরব, বেতনা, কোদলা ও ইছামতি নদী। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভৈরব ও বেতনা নদীর মোহনাতেই ছিল প্রাচীন যোগীন্দ্রদ্বীপ তথা সূর্য্যদ্বীপ রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র। নদীগুলোর সাথে এই জনপদের মানুষের সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে, কালের পরিক্রমায় মহেশপুরের অনেক মানুষ ভুলক্রমে ভৈরব নদীকেই কপোতাক্ষ নদ নামে উল্লেখ করে থাকেন।বেতনা নদীর বিলীন অস্তিত্বদুর্ভাগ্যবশত, মহেশপুরের নদীসভ্যতা আজ চরম সংকটে। বর্তমানে মহেশপুর পৌর এলাকার ভেতরে বেতনা নদীর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। দখল আর ভরাটের গ্রাসে নদীটি এতটাই হারিয়ে গেছে যে, স্থানীয় ডাকবাংলো থেকে জমিদারপাড়া পর্যন্ত সি.এস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) নকশাতেও এখন আর বেতনা নদীর কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। নদী হারানোর এই ক্ষত মহেশপুরের ভৌগোলিক ইতিহাসকে বিপন্ন করে তুলছে।নামের শেষে গ্রামবাংলার রূপমহেশপুর উপজেলার শত শত গ্রামের নাম বিশ্লেষণ করলে এক চমৎকার লোকজ ইতিহাসের সন্ধান মেলে। এই নামগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, নদী, বনভূমি, কৃষি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জীবনের নানা উপাদান।এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায় নামের শেষে ‘ডাঙ্গা’, ‘দিয়া’, ‘দহ',  ‘হুদা’, ‘পোতা’, ‘গাছা’, ‘পুর’, ‘পাড়া’, ‘নগর’, ‘বাড়ি’ ও ‘বাড়িয়া’ ইত্যাদি প্রত্যয়ের ব্যাপক ব্যবহার। প্রতিটি প্রত্যয়ই এক একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জানান দেয়।ডাঙ্গা ও দিয়ার নামকরণের রহস্যইতিহাসবিদদের ধারণা, প্রাচীনকালে নদীর তীরে পলি জমে উঁচু জমি বা ‘ডাঙ্গা’ তৈরি হলে, সেই ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী গ্রামের নামকরণ করা হতো। এর বড় উদাহরণ— বাগাডাঙ্গা, ভোলাডাঙ্গা, কুশাডাঙ্গা, সোনাইডাঙ্গা ও ঈর্ষালডাঙ্গা। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে দেখা যায়, এর মধ্যে বাগাডাঙ্গা ও ভোলাডাঙ্গা গ্রাম দুটি যথাক্রমে ইছামতি ও কোদলা নদীর একদম তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত।আবার এই অঞ্চলের নদীগুলোর মাঝখানে জেগে ওঠা দ্বীপ বা দ্বীপাঞ্চল পরিষ্কার করে যখন মানুষ প্রথম বসতি স্থাপন শুরু করে, তখন নামের শেষে ‘দিয়া’ ও ‘দহ’ যুক্ত করার প্রচলন ঘটে। জল ও স্থলের এই মিতালির প্রমাণ মেলে ভাবদিয়া, সূর্য্যদিয়া, রুপদাহ ও গুড়দহ নামের গ্রামগুলোর দিকে তাকালে।বনভূমি কেটে কৃষিজমিকালের আবর্তনে মহেশপুরের বনভূমি ও অনাবাদি জমি যখন কৃষিজমিতে পরিণত হতে থাকে, তখন জনবসতি বাড়ার সাথে সাথে যুক্ত হয় নতুন নতুন প্রত্যয়। বনাঞ্চল কেটে বসতি গড়ার প্রমাণ মেলে ‘গাছা’ বা ‘গাছি’ যুক্ত গ্রামে; যেমন— পীরগাছা, বামনগাছা ও বাথানগাছি। উঁচু বা আবাদী জমির সীমানা নির্দেশক ‘হুদা’ প্রত্যয় যুক্ত গ্রামের সংখ্যাও এ অঞ্চলে অনেক। এর মধ্যে শংকরহুদা, কালুহুদা, যোগীহুদা, গোয়ালহুদা, হুদা দুর্গাপুর, হুদা শ্রীরামপুর ও হুদাপাড়া উল্লেখযোগ্য।পোতা, তলা ও পাড়ার বৈচিত্র্যভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যে কোনো একটু উঁচু বা ভিটে জমি বোঝাতে ‘পোতা’ শব্দের ব্যবহার হতো। মহেশপুরের পাঁচপোতা, সাতপোতা, গাড়াপোতা, ভাষানপোতা, ঝিকটিপোতা, কচুয়ারপোতা, বাকোসপোতা, জেলেপোতা ও বাজীপোতা গ্রামগুলো এর বড় উদাহরণ।আবার ছায়া সুনিবিড় কোনো বড় গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জনবসতির নাম দেওয়া হতো ‘তলা’ প্রত্যয় দিয়ে। যার অনন্য উদাহরণ— বৈচিতলা, মান্দারতলা, চাপাতলা ও সাড়াতলা। একইভাবে নির্দিষ্ট পেশা, জাতি বা অঞ্চলের মানুষের বসতি নিয়ে গড়ে উঠেছে নানা ‘পাড়া’। যেমন— পান্তাপাড়া, নোয়ানীপাড়া, পোড়াপাড়া, নওদাপাড়া, ভাটপাড়া, রাঢ়ীপাড়া, কুঠিপাড়া, দোয়ারপাড়া, টাঙ্গাইল পাড়া ও জীবননগর পাড়া।ভাঙা, আইট ও বাড়িয়ার ইতিহাসনদীর ভাঙন বা ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা থেকে জন্ম নিয়েছে ‘ভাঙ্গা’ যুক্ত গ্রাম; যেমন— বাবলা মাথাভাঙ্গা ও ডালভাঙ্গা। জমির আইল বা উঁচু সীমানা থেকে এসেছে ‘আইট’ প্রত্যয়; যার প্রমাণ মেলে বাগদিয়ার আইট, মাৎলার আইট ও চুন্নির আইট গ্রামে। এছাড়া আদি বসতভিটার ঐতিহ্য বহন করছে ‘বাড়িয়া’ যুক্ত গ্রামগুলো। যেমন— মান্দারবাড়ীয়া, গাড়াবাড়িয়া, কুলবাড়িয়া, মাইলবাড়িয়া ও পেপুলবাড়িয়া।সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক মেলবন্ধনমহেশপুরের গ্রামগুলোর নামের মধ্যে কেবল ভূপ্রকৃতি নয়, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়েরও সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তি বা বংশের নামে ‘পুর’ প্রত্যয়যুক্ত বহু গ্রাম গড়ে উঠেছে। যার মধ্যে ইসলামপুর, সৈয়দপুর, আদমপুর, আজমপুর, আলমপুর, মির্জাপুর, আলিপুর, জলিলপুর, হামিদপুর, হানিফপুর ও সলেমানপুর উল্লেখযোগ্য।অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও দেব-দেবীর নাম অনুসারে গড়ে উঠেছে— শ্রীরামপুর, শ্রীনাথপুর, শ্যামকুড়, রামচন্দ্রপুর, শিবানন্দপুর, কালিপুর, লক্ষ্মীপুর, চন্ডিপুর, কৃষ্ণপুর, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, দুর্গাপুর, মদনপুর, গৌরীনাথপুর, রঘুনাথপুর, গোপালপুর, যাদবপুর, গয়েশপুর, শ্রীপুর, মতিলালপুর, কেশবপুর, যদুনাথপুর, বিশ্বনাথপুর, রায়পুর ও গোবিন্দপুর। আবার ‘নগর’ যুক্ত গ্রামের মধ্যে রয়েছে গোকুলনগর, মথুরানগর, বালিনগর ও দরবেশনগর।সংখ্যা, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যসংখ্যা নির্ভর নামের মধ্যেও রয়েছে ইতিহাসের ছাপ। যেমন— পাঁচপোতা, সাতপোতা, পাঁচবাড়িয়া, একতারপুর ও ছয়ঘরিয়া। এছাড়া গ্রামীণ প্রকৃতি, ফুল, ফল ও বৃক্ষের নামেও গড়ে উঠেছে বহু গ্রাম। মাছ বা জলজ প্রাণী সম্পর্কিত নামের মধ্যে রয়েছে কুষাডাঙ্গা ও কাকিলা দাড়ি। ফুলের নামে রয়েছে পদ্মপুকুর, পদ্মরাজপুর, কাঞ্চনপুর ও কদমতলা। ফলের নামে কুলতলা, লেবুতলা, কমলাপুর, ডুমুরতলা ও তালসার। বৃক্ষ বা গুল্মজাতীয় নামের মধ্যে বাঁশবাড়িয়া, ধানহাড়িয়া, তুলসীতলা, সরিষাঘাটা ও নিমতলা উল্লেখযোগ্য।লোকবিশ্বাস ও কৌতূহলজাগানিয়া নামআধ্যাত্মিক ও লোকবিশ্বাস নির্ভর নামের মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। যেমন— ভবনগর, মুন্ডুমালা, বাউলী, নিশ্চিন্তপুর, অনন্তপুর ও ডাকাতিয়া। এছাড়া কিছু ব্যতিক্রমধর্মী গ্রামের নাম আজও মানুষের কৌতূহলের কারণ হয়ে আছে। এর মধ্যে সামন্তা, পাকরাইল কাজীরবেড়, ভৈরবা, রুলি, জলুলী, পাথরা, সস্তা, নস্তি, নাটিমা, জাগুসা, জোকা, নেপা, কুল্লা ও সেজিয়া উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক গুরুত্বে মহেশপুরের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বমহেশপুরের দীর্ঘ ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছে এই জনপদে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা কিছু কালজয়ী মানুষের অবদানে। তাঁদের জীবন ও কর্ম এই অঞ্চলের অনন্য গৌরব: ১. বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ হামিদুর রহমান: বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের অন্যতম সিপাহী হামিদুর রহমান মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মাত্র ১৮ বছর বয়সে মৌলভীবাজারের ধলই সীমান্তে পাকিস্তানি হানাদারদের এক বাঙ্কার ধ্বংস করে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। মহেশপুরের এই বীর সন্তানের স্মৃতি রক্ষার্থে উপজেলার খালিশপুরে গড়ে তোলা হয়েছে 'বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার'। ২. পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার (১৭৭৫-১৮৪৬): ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এই দিকপাল মহেশপুরের ঐতিহ্যবাহী বজরাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। রামায়ণ ও মহাভারতের প্রথম বিশুদ্ধ সংস্করণ সম্পাদনা এবং বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধকরণে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ৩. খান সাহেব ফজলুর রহমান চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৫২): মহেশপুর উপজেলার সুন্দরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত প্রখ্যাত জমিদার বংশের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খান সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৪০-এর দশকে অবিভক্ত বাংলায় পাট শিল্প ও চাষের বৈপ্লবিক উন্নয়নে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সুন্দরপুরে আজও তাঁর ঐতিহাসিক রাজকীয় বসতভিটা ও কীর্তি বিদ্যমান। দত্তনগর খামার: মহেশপুরের অহংকারদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তীব্রতা যখন তুঙ্গে, তখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ তাজা সবজির। এই রসদ সরবরাহের ঠিকাদারি পান কলকাতার তৎকালীন প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ও সরকারি ঠিকাদার হেমেন্দ্রনাথ দত্ত। রসদের জোগান নিশ্চিত করতে ১৯৪০ সালে তিনি নিজের পৈত্রিক এলাকা ঝিনাইদহের মহেশপুরের নিভৃত পল্লী দত্তনগরে প্রায় ৩ হাজার একর জমি কিনে গড়ে তোলেন এক সুবিশাল ব্যক্তিগত খামার।যোগাযোগব্যবস্থা আদিম থাকায় উৎপাদিত তাজা সবজি দ্রুত কলকাতায় পাঠাতে তিনি খামারের ভেতরেই নিজস্ব হ্যালিপ্যাড তৈরি করেন, যেখান থেকে সরাসরি হেলিকপ্টারে করে সবজি উড়ে যেত সেনানিবাসে।১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর হেমেন দত্ত কলকাতায় চলে গেলে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং ১৯৬২ সালে নবগঠিত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে এর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা হস্তান্তর করা হয়।বর্তমানে এই খামারের মোট জমির পরিমাণ ২,৭৩৭ একর, যার মধ্যে প্রায় ২,৫০০ একর জমি সরাসরি চাষযোগ্য। নিচু জমি আছে প্রায় ৬০০ একর এবং ১ শত একরেরও বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে বিশাল বিল এলাকা। প্রশাসনিক ও নিবিড় উৎপাদন তদারকির সুবিধার্থে সমগ্র অঞ্চলকে ৫টি স্বাধীন ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। ইউনিটগুলো হলো— পাতিলা খামার, গোকুলনগর খামার, করিঞ্চা খামার, মথুরা খামার এবং কুশাডাঙ্গা খামার। এর সিংহভাগ অংশ ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় পড়লেও, এর সীমানা ছুঁয়ে গেছে পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলাকে।আধুনিকায়ন: সেচ ব্যবস্থা ও যান্ত্রিক কৃষিমান্ধাতা আমলের কৃষি পদ্ধতিকে পেছনে ফেলে দত্তনগর আজ আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য উদাহরণ। নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহের জন্য এই খামারে বসানো হয়েছে ৩৬টি গভীর নলকূপ, ১৩টি অগভীর নলকূপ এবং ১০টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাওয়ার পাম্প। অপচয় রোধে ক্ষেতে পানি সরবরাহের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ পাকা ড্রেন বা ক্যানেল। অতীতে হাজার হাজার শ্রমিক দিয়ে কাস্তে হাতে ফসল কাটা ও মাড়াই করা হতো। এখন খামারটিতে কম্বাইন হারভেস্টার, আধুনিক ট্রাক্টর এবং মেকানিক্যাল থ্রেসার ব্যবহারের মাধ্যমে রোপণ থেকে শুরু করে কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়।জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় অবদানদত্তনগর কৃষি খামারকে বলা হয় বাংলাদেশের "ভিত্তিবীজের কারখানা"। প্রতি বছর এখানে বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি ও মাঠের নিবিড় তত্ত্বাবধানে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন উচ্চ মানসম্পন্ন ভিত্তিবীজ উৎপাদিত হয়। উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড ধান, উন্নত জাতের গম, আলু, পাট, মুগ ডাল, ভুট্টা এবং সরিষার বীজ উৎপাদনে এটি অনন্য। মূল কৃষি খামারের পাশাপাশি এখানে রয়েছে একটি বড় গবাদি পশুর খামার, যা দেশের দুগ্ধ ও মাংসের চাহিদা মেটাতে কাজ করছে। খামারের নিজস্ব বিশাল বিলে উৎপাদিত হচ্ছে উন্নত জাতের মাছের পোনা। খামারের স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও প্রতিদিন প্রায় ১,৫০০ স্থানীয় কৃষি শ্রমিক এখানে জীবিকা নির্বাহ করেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে।নিবিড় জলাভূমি ও পরিযায়ী পাখির মেলা: প্রকৃতির এক অন্য ক্যানভাসশুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে শীত ও বসন্তের দিনগুলোয়, দত্তনগর খামার এক নয়নাভিরাম রূপ ধারণ করে। এখানকার দিগন্তজোড়া ফসলি মাঠের পাশাপাশি অনন্য এক মাত্রা যোগ করে খামারের নিজস্ব প্রায় দুই শত একরেরও বেশি সুবিশাল নিবিড় জলাভূমি ও বিল এলাকা। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই সুদূর সাইবেরিয়া ও হিমালয় অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ডানা মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি। সরালি, বালিহাঁস, পিনটেল আর কাদাখোঁচার মতো নানা জাতের অতিথি পাখির কলকাকলি ও ডানা ঝাপটানোর শব্দে নির্জন জলাভূমিগুলো এক জীবন্ত প্রাণপ্রাচুর্যে ভরে ওঠে।এই বিলগুলোর একপাশে যখন পাখিদের অবাধ বিচরণ, অন্যপাশে তখন চলে বিশাল মাঠের কর্মযজ্ঞ। কোথাও আধুনিক ট্রাক্টর দিয়ে চলছে জমি চাষের ব্যস্ততা, কোথাও কৃষকেরা ব্যস্ত বীজতলা থেকে কচি সবুজ চারা তোলায়, আবার ঠিক তার পাশেই দুলছে কাটার উপযোগী সোনালী ধানের শিষ। ফসলের জীবনচক্র আর জীববৈচিত্র্যের এমন মেলবন্ধন একই ক্যানভাসে দেখার বিরল দৃশ্য দেশের আর কোথাও মেলা ভার, যা উপভোগ করতে শীতকালে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের ভিড় জমে ওঠে।পরিবেশের ভারসাম্য ও বিপন্ন হিমালয়ী শকুন: এক ট্র্যাজিক অধ্যায়দত্তনগরের এই জীববৈচিত্র্য কেবল ছোট পাখিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে পরিবেশের এক অনন্য ও বিপন্ন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দেখাও মিলেছে। সম্প্রতি শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে সুদূর হিমালয় অঞ্চল থেকে উড়ে আসা বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় হিমালয়ী গৃধিনী জাতের একটি বিশালাকার শকুন মহেশপুর উপজেলার নাটিমা গ্রামের মাঠে তীব্র অসুস্থ ও অবসন্ন অবস্থায় ডানা ভেঙে পড়ে যায়। নাটিমা গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন প্রথম শকুনটিকে মাঠের মধ্যে ছটফট করতে দেখে পরম মমতায় উদ্ধার করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান।পরবর্তীতে স্থানীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মাধ্যমে খবর পেয়ে মহেশপুর উপজেলা বন বিভাগ এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দ্রুত পাখিটিকে উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি ও জখমের কারণে অবলা পাখিটিকে বাঁচানো যায়নি। কিন্তু এর পরিবেশগত গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে মৃত শকুনটিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মমি বা ট্যাক্সিডার্মি করা হয়। বর্তমানে ঝিনাইদহ সরকারি কেশব চন্দ্র (কেসি) কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রদর্শনের জন্য এটি পরম যত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি যেমন এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের প্রমাণ দেয়, ঠিক তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের আরও সচেতন হওয়ার বার্তা দিয়ে যায়।ইতিহাসের নীরব সাক্ষীস্থানীয় প্রবীণদের মতে, মহেশপুরের প্রতিটি গ্রামের নামের পেছনে রয়েছে আলাদা ইতিহাস, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও লোকজ স্মৃতি। গবেষকদের ধারণা, এসব নাম শুধু একটি জনপদের পরিচয় বহন করে না, বরং শত শত বছরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হিসেবেও টিকে আছে গ্রামবাংলার মানচিত্রে। মাকসুদুল হক( লেখক , কলামিস্ট ও সাংবাদিক )

ভৈরব-বেতনার মহেশপুর  নদী ও জনপদ
🔒