উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
সকালে খালি পেটে কাজে বের হওয়ার সময় ছোট ছোট দুই মেয়ের নিষ্পাপ চোখের পানে তাকালে বুকটা ফেটে যায় চাঁদ আলী খানের। হৃদয়ে জমাট বাঁধে সীমাহীন কষ্ট আর হতাশা। স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন শিক্ষকতা করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন, ঘরে দুবেলা দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু বিধিবাম! যৌবনের আঠারোটি বছর পার করলেও ভাগ্যে বেতন জোটেনি। ফলে সংসর চালাতে ঝিনাইদহ শহরের ক্যাডেট কলেজ পাড়ার বাসিন্দা চাঁদ আলী এখন ঋণের অতল সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছেন, চলছেন ধারদেনার ওপর ভর করে। প্রতি মুহূর্ত কাটছে তীব্র অভাব, বঞ্চনা আর চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে।
দুঃসহ এই জীবনকাহিনীর সূত্রপাত ২০০৪ সালে। ‘১০০টি নির্বাচিত মাদরাসায় দাখিল ভোকেশনাল কোর্স প্রবর্তন’ শীর্ষক সরকারি প্রকল্পের আওতায় হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বলরামপুর দাখিল মাদ্রাসায় ট্রেড ইন্সট্রাক্টর পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন তিনি। ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষায় কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সুনির্দিষ্ট সুপারিশে ২০০৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তাঁর চূড়ান্ত সুপারিশপত্র আসে। অতঃপর ২০০৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মাদ্রাসায় যোগদান করেন।
প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামো দাঁড়াল, সরকারি সরঞ্জামও এল; কিন্তু রহস্যজনকভাবে ঝুলিয়ে রাখা হলো চাঁদ আলীর ভাগ্য। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল সরকারি বিধি মোতাবেক এমপিওভুক্তির মাধ্যমে বেতন-ভাতা প্রদান করা হবে। অথচ দিনের পর দিন, বছরের পর বছর গড়িয়ে দীর্ঘ ১৮টি বছর পার হলেও এক টাকা বেতন পাননি এই ভুক্তভোগী। অধিকার আদায়ের আশায় কারিগরি শিক্ষা দপ্তরের দুয়ারে দুয়ারে কত যে কড়া নেড়েছেন, কিন্তু প্রশাসনের কাছ থেকে মিলেছে কেবলই দীর্ঘ আশ্বাস, কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
বেতন না পেয়ে একদিকে যখন ধেয়ে এসেছে তীব্র অভাব, অন্যদিকে মাথায় চেপেছে পাওনাদারদের ঋণের বোঝা। ছোট দুই মেয়ের লেখাপড়া, মুখের খাবার আর পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে একের পর এক জায়গা থেকে ধারদেনা করতে করতে চাঁদ আলী এখন দিশেহারা ও নিঃস্ব।
চোখের কোণে অশ্রু আর কণ্ঠে করুণ আকুতি ঝরিয়ে চাঁদ আলী খান বলেন, "আঠারোটা বছর পার হয়ে গেল, এক টাকা বেতন পেলাম না। চাকরি করি অথচ পরিবারকে দুবেলা ডাল-ভাত খাওয়াতে পারি না। ঋণের পাহাড় জমেছে, কিন্তু তা শোধ করার কোনো রাস্তা নেই। বড় একা লাগে, যখন দুই মেয়ে না খেয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে! এত বছর সততার সাথে সেবা দিয়েও যদি না খেয়ে মরতে হয়, তবে বেঁচে থেকে লাভ কী? সরকারের কাছে আমার বিনীত ও আকুল আবেদন—আমাদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করে অন্তত দুমুঠো খেয়ে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগটুকু দিন।"
আঠারো বছরের বঞ্চনা শেষ করে চাঁদ আলীর পরিবার কি ফিরতে পারবে স্বাভাবিক জীবনে? নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালেই শেষ হয়ে যাবে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন? এমন মানবিক প্রশ্নে আজ স্তম্ভিত সচেতন সমাজ।