উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, আত্মহত্যার জন্য ব্যবহার করা যায় এমন সরঞ্জাম নাগালের বাইরে রাখতে হবে। যাদের আত্মহত্যার প্রবণতা আছে, তাদের সাহায্য করতে হবে, দূরে সরিয়ে দেওয়া যাবে না, অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তাঁদের পাশে বসে কেন এমন বলছেন, কেন এমন অনুভব করছেন তা জানতে হবে। তীব্র বিষণ্নতায় কোনো কিছু করার আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়। তাঁদের পাশে থেকে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। সবার মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা এক নয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
আত্মহত্যা অপরাধ নয়, এটা মানসিক সমস্যা
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা করলে এবং আত্মহত্যা সংঘটনের উদ্দেশ্যে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিলে, তাকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত সাধারণ কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। তবে এই আইন পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইনবিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা কোনো অপরাধ নয়, এটি একটি মানসিক সমস্যা। কোনো ব্যক্তি যখন আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন, সেটি কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা থাকতে পারে। তাই প্রচলিত ব্রিটিশ আইনে যেভাবে আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়, তা বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনিতেই আত্মহত্যার সময় একজন ব্যক্তির মানসিক নিপীড়নের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। ওই সময়ে আইনের বেড়াজালে তাকে ফেলে দিলে তিনি আরও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন।
তিনি আরও বলেন, ব্রিটিশ কলোনিভুক্ত দেশগুলো উক্ত আইনটি অনেক আগেই রহিত করে দিয়েছে। কয়েক বছর আগে শ্রীলঙ্কাও ওই আইনটি রদ করে ভালো সাফল্য পেয়েছে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, আত্মহত্যাকে আমাদের সব ধর্মেই মহাপাপ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি যেহেতু কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স নয়, বরং মানসিক সমস্যা, তাই এটিকে একটি রোগ হিসেবেই মোকাবিলা করতে হবে। এ আইন থাকার ফলে গ্রামাঞ্চলে আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যেমন, এ ধরনের রোগীদের কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে চায় না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সম্ভব হলেও সার্বক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তার আশপাশে থাকেন। ফলে তিনি মানসিকভাবে আরও বিব্রত হন।
ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নওফেল জামির বলেন, কিছু আইনগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। তিনি জানান, তাদের ফাউন্ডেশনের কাজ হচ্ছে নীতি নির্ধারণ এবং আইনের বিষয় নিয়ে কাজ করা। আত্মহত্যা একটি স্পর্শকাতর বিষয়। ধর্মীয় বিষয় এবং আইনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। ধর্মে নিষেধ থাকলেও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমাদের সামাজিক বিভিন্ন ট্যাবু থেকে বেরিয়ে এসে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী আত্মহত্যার ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই আইনের ফলে এর সঙ্গে যুক্ত স্টিগমাগুলো আরও বাড়ছে। প্রান্তিক মানুষ কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানেন না। সমাজে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে টেলিকাউন্সেলিং ও কিছু কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। টারশিয়ারি সেন্টারের যেকোনো মানুষ যেন জানতে পারেন কোথায় যেতে হবে এবং কার কাছে যেতে হবে। এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সরকার থেকে আমরা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে কাজ করব।
প্রসঙ্গত, আজ (১০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস-২০২৬। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘আত্মহত্যা সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তন’।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২২৪টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে স্কুল ও সমমান পর্যায়ের শিক্ষার্থী রয়েছেন ১২৭ জন। কলেজ ও সমমান পর্যায়ে ৪৭ জন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ১৩২ জন এবং পুরুষ ৯২ জন। অর্থাৎ, গত আট মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তারা এ তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরের তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা ও প্রচেষ্টার প্রবণতা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি। শহরের ৮ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানিয়েছেন, যেখানে গ্রামাঞ্চলে এ হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে অল্প বয়সে বিয়ে, বেকারত্ব ও পারিবারিক সহিংসতার মতো সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক বিষয় আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দেশে আত্মহত্যার ঘটনা তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং শিক্ষার্থী ও গৃহিণীরাও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়, আত্মহত্যার পেছনে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা কারণ হলো পারিবারিক দ্বন্দ্ব। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সম্পর্কজনিত সমস্যা, দাম্পত্য কলহ, পড়াশোনায় ব্যর্থতা, পরীক্ষার চাপ, আকস্মিক রাগ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বিষণ্নতা, বেকারত্ব ও মাদকাসক্তিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অনেক আত্মহত্যার প্রচেষ্টা তাৎক্ষণিক ও অপরিকল্পিতভাবে ঘটে।
আত্মহত্যার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলা, ফাঁস ও বিষপান উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি। অতীতে বাংলাদেশে কীটনাশক পান আত্মহত্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ছিল। গবেষণায় আত্মহত্যা প্রতিরোধে ক্ষতিকর উপকরণের সহজলভ্যতা কমানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা এবং সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তা বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
তরুণদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে নীরবতা ভেঙে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা, সামাজিক কলঙ্ক দূর করা এবং ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের জন্য কার্যকর ও সহজলভ্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেন, আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের লিড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সায়েদুল ইসলাম সাইদ মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। আমরা সকলে চাইলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। আত্মহত্যার একক কোনো কারণ নেই; বরং এটি অনেকগুলো সমস্যার ফলাফল। কেউ আত্মহত্যার কথা বললেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং তাঁকে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে প্রতি এক লাখ ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের মধ্যে প্রায় ১৮ জন আত্মহত্যায় মারা যান। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে তরুণদের আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। বক্তারা বলেন, এ প্রবণতা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে জরুরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।