উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিহত পরিবারের সদস্যরা।
প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে বলেন, “কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।”
গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, “পুলিশ যা বলছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের শরীরের যে অবস্থা, তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে।”
অভিযুক্ত দুই তরুণের পরিবারও হত্যার অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছে না।
সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস বলেন, “আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
মুগ্ধের মা সেনা দাস বলেন, “ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।”
রোববার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। পরে আটক সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন, “এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে ভোরে আটক করা হয়। পরে তারা হত্যায় জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ কারণে মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।”
পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর বোনের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। এরপর শনিবার ফোন করলে পরিবারের সবার নম্বর বন্ধ পান। কোনো সাড়া না পেয়ে স্বামীকে নিয়ে রাতে বাড়িতে গিয়ে পাশের ভবন থেকে জানালার কাচ ভেঙে ঘরের ভেতর তছনছ অবস্থা দেখতে পান। এরপর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
রাত ১১টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। গভীর রাতে চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়।
রংপুর শহরের কামালকাছনা এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ বলছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় দুই তরুণ পরিকল্পিতভাবে চারজনকে হত্যা করে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে নিহত পরিবারের স্বজনেরা এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ।
পুলিশ জানিয়েছে, দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ, তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। আর ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ, তাঁর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল।
ঘটনার প্রতিবাদে রোববার দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। পরে তারা শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং হত্যায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
রংপুর মহানগর জামায়াতও বিকেলে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে। সমাবেশে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, “একটি পরিবারের চারজন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার এমন ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনায় নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র দুজন মাদকসেবী কীভাবে একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করলেন, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।”
গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। প্রায় তিন বছর আগে তিনি কামালকাছনায় নিজের তিনতলা বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেন।
বোন, জামাতা ও দুই ভাগনে-ভাগনির মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পূজা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, “কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের তো শত্রুও নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই!”
শনিবার রাতে নগরের কামালকাছনা এলাকার নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশ একই বাড়িতে থাকতেন।
ঘটনার পর রোববার ভোরে সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামে দুই তরুণকে আটক করে পুলিশ। পরে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পুলিশের দাবি, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি দেখে বাধা দিলে তাকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ বলছে, গণপতির চিৎকার শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে তাদেরও হত্যা করা হয়। পরে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ১৩ বছর বয়সী আয়ুশকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
পুলিশ কমিশনার বলেন, নিহত পরিবারের সঙ্গে দুই তরুণের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তারা একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করেন।
পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পরও দুই তরুণ ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন। সেখানে গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা খেয়ে আবার ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। যাওয়ার আগে আলমারি ও ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দিয়ে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন।
ঘর থেকে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব সূত্র ধরেই দুই তরুণকে শনাক্ত করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করতেন। সিদ্ধার্থ দাস দীর্ঘদিন একটি গয়নার দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।