উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
"আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে..." জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী দেশাত্ববোধক- কবিতার সেই রূপসী বাংলা যেন এখন মূর্ত হয়ে উঠেছে ঝিনাইদহ, যশোর ও চুয়াডাঙ্গার গ্রামীণ জনপদে।
কার্তিকের শুরুতেই পাকা ধানের গন্ধ আর ভোরের হালকা
কুয়াশা জানান দিচ্ছে নবান্নের আগমনী বার্তা। আর এই নবান্নের উৎসবের সঙ্গেই যুক্ত
হয়েছে বাঙালির শীতের আরেক চিরন্তন ঐতিহ্য— খেজুর রস ও গুড় তৈরির তোড়জোড়।
গ্রামীণ
জনপদে গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খেজুর গাছ ছাঁটাইয়ের প্রাথমিক কাজ বা 'গাছ তোলা'র আগাম প্রস্তুতিতে। তবে নবান্নের এই আনন্দ উদযাপনের
সমান্তরালে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে কড়া সতর্কতা
জারি করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
আনন্দের আড়ালে মৃত্যুঝুঁকি: কাঁচা রসে বিশেষজ্ঞদের কড়া নিষেধাজ্ঞা
শীতকালীন এই উৎসবের আমেজে কাঁচা খেজুরের রস পানের
মাধ্যমে ছড়ানো নিপাহ
ভাইরাস (Nipah Virus) নিয়ে দেশজুড়ে বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
·
বাদুড়ের লালা ও মূত্র: রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR)-এর মতে, রাতে গাছে রস সংগ্রহের জন্য পাতা
হাঁড়িতে নিশাচর বাদুড় মুখ দিয়ে রস খাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় বাদুড়ের লালা এবং
মূত্র রসের সঙ্গে মিশে যায়।
· উদ্বেগজনক মৃত্যুহার: নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত বাদুড়ের দূষিত এই কাঁচা রস
মানুষ পান করলে মুহূর্তেই আক্রান্ত হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত
রোগীদের মৃত্যুহার
প্রায় ৭১ থেকে ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ, আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে ৭ জনেরই
মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।
অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ: খোলা হাঁড়িতে পাখি বা কীটপতঙ্গের মলমূত্র সরাসরি
রসের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ফলে মারাত্মক ডায়রিয়া, তীব্র বমি ও আমাশয় দেখা দেয়। বিশেষ করে শিশুদের
ক্ষেত্রে এই জটিলতা দ্রুত মারাত্মক রূপ নেয়।
·
সুরক্ষিত
থাকার উপায়: রস উপভোগ করবেন যেভাবে
স্বাদ ও ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে কোনোভাবেই কাঁচা রস পান
করা যাবে না। রস পানের নিরাপদ উপায়গুলো হলো:
·
ভালোভাবে ফুটিয়ে নেওয়া: খেজুরের রসের স্বাদ নিতে হলে রস সংগ্রহের পর তা
অবশ্যই ভালোভাবে ফুটিয়ে বা ন্যূনতম ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরম করে পান করতে হবে। এতে নিপাহ ভাইরাস ও সব ধরনের ক্ষতিকর
ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
· গুড় ও পাটালি সম্পূর্ণ নিরাপদ: রস থেকে তৈরি খাঁটি গুড় বা পাটালি উচ্চ তাপে দীর্ঘ
সময় জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় বলে তা খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ।
মাঠে মাঠে গাছিদের ব্যস্ততা:
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোরের কুয়াশা মোড়ানো সকালে গাছিরা কোমর বেঁধে মাঠে মাঠে খেজুর গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ করছেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে গাছে মাটির ভাঁড় বাঁধা শুরু হবে এবং অগ্রহায়ণের শুরুতে নবান্নের নতুন ধানের চালের পিঠাপুলির সাথে সুসজ্জিত হবে নলেন গুড় ও পাটালি।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং ইটভাটায় খেজুর গাছ
পোড়ানোর কারণে দিন দিন গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে বেগ পেতে
হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
কার্তিকের
নবান্নের এই দেশে ঐতিহ্যের আনন্দকে ধরে রাখার পাশাপাশি নিজেদের জীবন সুরক্ষিত
রাখতে কাঁচা রস পানের অভ্যাস থেকে সবাইকে বিরত থাকার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে
স্বাস্থ্য বিভাগ।