উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
ব্যাসদেবের জ্ঞানসমুদ্র; উপমহাদেশের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি
পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পৃষ্ঠাগুলো ওল্টালে এক পরম বিস্ময়কর সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি যে আঠারোটি মহাপুরাণ, উপপুরাণ এবং পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় গ্রন্থ—সেই মহাকাব্য 'মহাভারত'-এর কালজয়ী রচয়িতা মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস (যিনি ব্যাসদেব নামে সমধিক পরিচিত) ছিলেন আমাদের এই উপমহাদেশের পলিমাটিরই সন্তান। যমুনা নদীর এক নিভৃত দ্বীপে জন্ম নেওয়া এই মহান ঋষি ও জ্ঞানসাধক এই অঞ্চলের মানুষকে যে বিপুল জ্ঞানসমুদ্র, দর্শন এবং কর্মের নৈতিকতার পাঠ দিয়ে গিয়েছিলেন, তা সমকালীন বিশ্ব সভ্যতার জন্য ছিল এক পরম আলোকবর্তিকা।
ব্যাসদেব তাঁর গ্রন্থগুলোতে অলৌকিক আচারের চেয়ে মানুষের 'কর্ম' এবং 'জ্ঞান'-কে সবচেয়ে ওপরে স্থান দিয়েছিলেন। মহর্ষি বেদব্যাস তাঁর আঠারোটি পুরাণ এবং মহাভারতের লক্ষাধীক শ্লোকের পরম সত্যকে একটিমাত্র চরণে সংক্ষেপ করে গেছেন:
"পরোপকারায় পুণ্যং, পাপায় পরপীড়নম্"। অর্থাৎ, জগতের সমস্ত ধর্মীয়
আচার,
গ্রন্থ এবং উপাসনার একমাত্র শেষ কথা হলো দুটি—পরের উপকার করাই হলো
প্রকৃত পুণ্য,
আর অন্যকে কষ্ট দেওয়া বা অন্যের অধিকার হরণ করাই হলো পরম পাপ।
কিন্তু সমসাময়িক উপমহাদেশের দিকে তাকালে ব্যাসদেবের এই মহান
দর্শনের এক করুণ বিচ্যুতি চোখে পড়ে। দেব-দেবীর কল্পিত রূপ এবং মৃন্ময় মূর্তির সাথে
যদি ভক্তের নিজের চারিত্রিক গঠনের এবং কর্মজীবনের কোনো ইতিবাচক মিল বা সাফল্য না
থাকে,
তবে সেই উপাসনা কেবলই লোক দেখানো ভণ্ডামি এবং সামাজিক প্রদর্শনের উৎসব ছাড়া
আর কিছুই নয়।
আচারের অন্ধত্ব বনাম মেধার চারণভূমি: সরস্বতী পূজা ও চীনের বাস্তবতা
আমাদের এই উপমহাদেশ জুড়ে কালান্তরের এক দীর্ঘ
ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ হলো বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী মা সরস্বতীর আরাধনা। কিন্তু এই
ভক্তির সমান্তরালে যখন আমরা হাজার বছরের বৈশ্বিক ইতিহাসের পাতা ওল্টাই, তখন এক পরম পরিতাপের ও
নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। যে উপমহাদেশে বিদ্যার দেবীর চরণে কোটি কোটি
শিক্ষার্থীর মাথা নত হচ্ছে, সেই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ বৈশ্বিক মানে
ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে।
অথচ হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষী দেয়—কাগজ, কম্পাস, বারুদ থেকে শুরু করে
মুদ্রণযন্ত্রের মতো পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলো এসেছে
সুদূর চীন থেকে। আজ আধুনিক বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা মহাকাশ গবেষণার দিকে
তাকালে দেখা যায়,
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেধাবী বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের এক বিরাট অংশই চীন বা
পশ্চিমা বিশ্বের চারণভূমি থেকে উঠে আসছে, যেখানে দেবী সরস্বতীর
কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পূজা বা আনুষ্ঠানিক আরাধনার অস্তিত্বই নেই।
৩. যন্ত্রের উপাসনা বনাম কর্মের শ্রেষ্ঠত্ব: বিশ্বকর্মা পূজা ও জার্মানির শিল্পায়ন
আমাদের এই উপমহাদেশে কলকারখানা ও উৎপাদন শিল্পের
সুরক্ষায় যুগ যুগ ধরে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনা করা হচ্ছে, অনেক অঞ্চলে সরকারি বা
প্রাতিষ্ঠানিক ছুটিও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এবং বর্তমান
বৈশ্বিক বাস্তবতার দিকে তাকালে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা খেতে হয়।
যে উপমহাদেশ শত বছর ধরে শিল্পের দেবতার চরণে
তেল-সিঁদুর ঢালছে,
সেই অঞ্চলের অটোমোবাইল শিল্প আজ বৈশ্বিক
মানে কতটা পিছিয়ে,
তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ জার্মানি নামক দেশটির দিকে তাকালে দেখা যায়, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ কিংবা অডির
মতো বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক গাড়িগুলো তৈরি করে মোটর প্রকৌশলে তারা
বিশ্বজোড়া শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। সেখানে কোনো বিশ্বকর্মার মন্দির নেই, নেই কোনো সিঁদুর-ঘৃতের
বন্দনা।
মাতৃত্বের ভণ্ডামি বনাম প্রকৃতির অধিকার: গঙ্গা-যমুনার দূষণ ও বেলজিয়ামের শিক্ষা
আমাদের এই উপমহাদেশের সংস্কৃতি ও লোক-দর্শনে নদী
কেবল কোনো জলধারা নয়; নদী এখানে পরম পূজনীয় 'মা'। কিন্তু
এই অন্ধ ভক্তির সমান্তরালে যখন বাস্তব পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি, তখন দেখা যায় বিশ্বের
সবচেয়ে দূষিত এবং মৃতপ্রায় নদীগুলোর তালিকায় বুড়িগঙ্গা, গঙ্গা ও যমুনার নাম সর্বাগ্রে রয়েছে।
কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, প্লাস্টিক ও আবর্জনাতৈরি অবলীলায় ঢেলে দেওয়া
হচ্ছে এই পবিত্র মায়েদের বুকে। অথচ ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামের নদীগুলোকে সেখানকার
মানুষ কোনো অলৌকিক দেবী বলে পুজো করে না, নদীকে মা ডেকে নদীতে
ফুল-বেলপাতাও ভাসায় না। কিন্তু আজ তাদের নদীগুলো বিশ্বের অন্যতম পরিষ্কার এবং
জীবন্ত জলধারা।
৫. অহিংসার মুখোশ ও গণহত্যার উৎসব: গৌতম বুদ্ধের বাণী বনাম মিয়ানমারের নির্মমতা
আড়াই হাজার বছর আগে এই উপমহাদেশের পবিত্র পলিমাটিতে দাঁড়িয়ে মহাত্মা গৌতম বুদ্ধ মানবজাতিকে পরম মৈত্রী, দয়া ও শুদ্ধাচারের পাঠ দিয়ে গেছেন। বৌদ্ধ দর্শনের মূল ভিত্তি এবং ত্রিসন্ধ্যা প্রার্থনায় অবুঝ মন যে কালজয়ী শ্লোকটি পরম ভক্তিভরে উচ্চারণ করে, তা হলো—
"সব্বে সত্তা সুখিতা
হোন্তু,
অবেরা হোন্তু, অব্যাপজ্ঝা হোন্তু, অনীঘা হোন্তু, সুখী অত্তানং
পরিহরন্তু।"
(অর্থ: জগতের সকল জীব বা প্রাণী সুখী হোক, বৈরিতা ও শত্রুতামুক্ত
হোক,
হিংসামুক্ত হোক, দুঃখ ও রোগমুক্ত হোক
এবং তারা পরম সুখে জীবন যাপন করুক।)
এই পালি শ্লোকের সমান্তরালে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে আরও এক
অমোঘ চরণের অবতারণা করা হয়—"অহিংসা পরম ধর্ম, জীব হত্যা মহাপাপ"। একটি সামান্য কীট বা
জীবকে আঘাত করাও যেখানে এই দর্শনে পরম নিষিদ্ধ, সেখানে সমসাময়িক
বৈশ্বিক মানচিত্রে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের দিকে তাকালে এক তীব্র
মনস্তাত্ত্বিক হাহাকার আর মানবতাবিরোধী নগ্নতা আমাদের গ্রাস করে।
যে দেশকে আমরা পুণ্যভূমি বলে মঞ্চে জাঁকজমক করছি, সেই দেশেরই এক শ্রেণীর ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বুদ্ধের অহিংসার বাণী বুকে ধারণ করা এক শ্রেণীর শ্বেতবস্ত্রধারী ভিক্ষু আর সামরিক জান্তার মদদে কীভাবে মিয়ানমারের মাটিতে হাজার হাজার রাখাইন (রোহিঙ্গা) মুসলিমদের ওপর এমন বিভীষিকাময় ও নির্মম গণহত্যা চালানো সম্ভব হলো? কীভাবে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে, পুড়িয়ে, ধর্ষণ করে বর্বরোচিত উপায়ে উদ্বাস্তু বানিয়ে সীমান্ত পার হতে বাধ্য করা হলো? যেখানে একটি জীবের কষ্ট দেখে বুদ্ধের হৃদয় কেঁদে উঠেছিল, সেখানে একবিংশ শতাব্দীতে এসে তাঁরই অনুসারীদের হাতে মানবজাতির এমন কুৎসিত ও রক্তক্ষয়ী উচ্ছেদ কোনো বৌদ্ধ ধর্ম বা দর্শন সমর্থন করতে পারে না।
মাকসুদুল হক
(সাংবাদিক ও কলামিস্ট, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ)