উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
উপমহাদেশের
ধর্মবিশ্বাস ও কর্মজীবন-
প্রথম অধ্যায়ঃ ভূমিকা-
ধর্ম
মানুষের আত্মিক মুক্তির অন্বেষা, নাকি সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের নৈতিক আচরণের মাপকাঠি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই
আমাদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় এক নির্মম সমাজবাস্তবতার। এই উপমহাদেশ আধ্যাত্মিক
পলিমাটিতে গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত চারণভূমি। এখানে ধর্মের বাহ্যিক জাঁকজমক আর আচারের
কোনো কমতি নেই। উপাসনালয়গুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়, চোখ ধাঁধানো উৎসবের আবহ আর মাইকের
সুউচ্চ আওয়াজে চারদিক মুখরিত হয়। কিন্তু যেই মুহূর্তে এই বাহ্যিক ধার্মিকতার খোলস
ছেড়ে মানুষ তার বাস্তব কর্মজীবনে—অফিস-আদালতে,
ব্যবসা-বাণিজ্যে কিংবা হাটে-বাজারে প্রবেশ করে, অমনি এক অদ্ভুত নৈতিক দেউলিয়াত্ব
আমাদের গ্রাস করে।
আজ
থেকে দেড়শো বছরেরও বেশি সময় আগে ফকির লালন শাহ গেয়েছিলেন, " সত্য
কাজে কেউ নয় রাজি, সবই দেখি তানা নানা..."। উনবিংশ
শতকের সেই বাউল দর্শন একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসেও আমাদের
সামাজিক ও কর্মজীবনে কতটা নির্মমভাবে সত্য,
তা প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজের পাতায় চোখ রাখলেই
টের পাওয়া যায়। আমরা উপাসনালয়ে ধার্মিক,
কিন্তু কর্মক্ষেত্রে চরম অধার্মিক—এই দ্বিচারিতাই আজ আমাদের সমাজকে
ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
এই
গ্রন্থে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সমালোচনা করা হয়নি,
বরং এই উপমহাদেশের প্রচলিত প্রধান তিনটি ধর্ম ও
জীবনদর্শনের—অর্থাৎ
সনাতন ধর্মের বৈদিক জ্ঞান, ইসলাম ধর্মের ঐশী বিধান, বৌদ্ধ ধর্মের অহিংস মৈত্রী এবং
লালন-নজরুলের লৌকিক সুফি দর্শনের গভীরতম সারমর্মকে মানুষের 'মানবিক কাজ' এবং সমকালীন 'অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা'র কষ্টিপাথরে যাচাই করার চেষ্টা
করা হয়েছে।
মহর্ষি
বেদব্যাসের পুরাণের সেই অমোঘ বাণী—"পরোপকারায় পুণ্যং, পাপায়
পরপীড়নম্"; বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সেই অতুলনীয়
পরমতসহিষ্ণুতা ও ইনসাফের চরিত্র; মহামতি গৌতম বুদ্ধের সর্বজনীন পালি শ্লোক—"সব্বে
সত্তা সুখিতা হোন্তু..."; আর লালন সাঁইজির অন্তরের শুদ্ধতার পাঠ—এই সবকটি বাতিঘরের মূল নির্যাস
আসলে একটিমাত্র বিন্দুতেই এসে মিলিত হয়েছে। তা হলো—মানুষের প্রতি 'মানবিক কাজ'
এবং জীবনের 'শুদ্ধ নৈতিক আচরণ'।
অথচ আমরা মূর্তির খোলসটাকে খুব যত্নে আঁকড়ে ধরেছি, কিন্তু সরস্বতী বা বিশ্বকর্মার আসল মেধা ও কর্ম সাধনাকে বিসর্জন দিয়েছি। যার বিপরীতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পূজার পেছনে না ছুটেও কেবল কর্মের সততা আর বিজ্ঞান দিয়ে আমেরিকা, চীন কিংবা জার্মানি বিশ্বের বুকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।
আমরা কুরআনের পাতায় পাতায় থাকা বিশ্বাসের সমান্তরালে সৎকর্মের বিধান ভুলে ইবাদতের
বাহ্যিক প্রদর্শনকে বাড়িয়েছি; দিন শেষে দেখা যায় ওমরি চরিত্রের ইনসাফ আমাদের সমাজ
ও শাসনব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আমরা বুদ্ধের অহিংসার বাণী জপ করছি, অথচ আমাদের চোখের সামনেই
প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সংঘটিত হচ্ছে ইতিহাসের নির্মমতম গণহত্যা ও উচ্ছেদ।
বিদ্রোহী
কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর চাবুক লেখনীতে স্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন—"গোঁড়ামি
ধর্ম নয়"। গোঁড়ামি আর লোক দেখানো অন্ধত্ব
মানুষকে ভেতর থেকে নৈতিকভাবে পঙ্গু ও অমানবিক করে তোলে, আর প্রকৃত ধর্ম মানুষের মনকে উদার
করে সুপথে চালায়। ধর্ম কোনো পরিধেয় পোশাক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা জাহির করার সামাজিক
উৎসব নয়; ধর্ম
হলো জীবনের যাপন, চরিত্রের
শুদ্ধতা এবং কর্মের সততা।
পাণ্ডুলিপিটি
রচনার মূল উদ্দেশ্যই হলো আমাদের এই "অবুঝ মন"কে জাগানো। যেদিন আমাদের
প্রতিদিনের কর্মজীবন, অফিসের টেবিল,
ব্যবসায়ের দাঁড়িপাল্লা এবং মানুষের প্রতি আমাদের
আচরণ পবিত্র হয়ে উঠবে, যেদিন মানুষের সেবা আর কর্মের সততাই হয়ে উঠবে আমাদের
সত্যিকারের উপাসনা—ঠিক সেদিনই এ উপমহাদেশে এক আলোকময়, মানবিক ও সাম্যের সমাজ গড়ে উঠবে।
আশাকরি, এই
গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায় পাঠককে নতুন করে ভাবতে এবং নিজের ভেতরের অন্তর্দৃষ্টিকে
জাগ্রত করতে সাহায্য করবে।
মাকসুদুল
হক
(সাংবাদিক ও কলামিস্ট, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ)